জয়সলমির জমজমাট

—  সাগ্নিক চ্যাটার্জী

আমার সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যত ধরণের ‘দাদা’ এবং ‘দিদি’ আছেন, তাঁরা সকলে এক ‘পক্ষ’, ফেলুদা অন্যদিকে দাঁড়িয়ে ‘প্রতিপক্ষ’। ফেলুদার সঙ্গে সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের থেকেও অনেক গভীরের…অনেক খাঁটি। এই দাদাকে কোনদিন দেখতেও পেলাম না, কথা কইতেও পারলাম না। অথচ সেই হাফপ্যান্ট পরা দিনগুলো থেকে, আজও যখন আমার ছেলে হাফ-প্যান্ট এজ সামনে দেখি, ফেলুদার সব ওঠা-পড়া,কেটে-ছড়ে যাওয়া সময়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য অংশীদার হিসেবে রয়ে গেল। রক্তের সম্পর্ক নেই বলেই হয়ত এই চিরকালীন বন্ধুত্ব।

ফেলুদাকে নিয়ে তথ্যচিত্রের মতলবটা মাথায় ঘুরপাক খায় ২০০৭ নাগাদ। বাবুদার (সন্দীপ রায়) সঙ্গে তখন ‘টিনটোরেটোর যীশু’তে সহকারী হিসাবে ছবি শেষ করতে ব্যস্ত। সেই প্রথম সত্যজিত রায়ের লাইব্রেরীতে অন্যান্য অনেকগুলো ভাষায় অনুবাদ করা ফেলুদার বইগুলো দেখি। ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, মালায়ালম, মারাঠি- আরো কত কি। ঠিক করি ছবিটা কোনদিন বানালে, ফেলুদাকে শুধু বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশের মধ্যে আটকে রাখব না। ফেলুদা, সত্যজিত রায়ের মতই সর্বভারতীয়- এমনকি ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ বললেও বাড়াবাড়ি হবেনা।

ফেলুদা আমার তথ্যচিত্রে সিনেমা নির্ভর নয়, মূল সূত্র- বাংলা ভাষায় লেখা সন্দেশ-আনন্দমেলা বইগুলো এবং এই দুই জায়গায় হাতে আঁকা ছবিগুলো। সিনেমা, রেডিও প্লে, কমিকস, অনুবাদ- আরো হরেক ‘ফর্ম’ হল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ‘কন্ট্রিবিউশন’। সবকিছু মিলিয়ে ‘ফেলুদা’। এর মধ্যে সিনেমা, টেলিভিশন আমার মতে খুবই ইম্প্যাক্টফুল। আর ফেলুদার গল্পের মূল আকর্ষন হল দেশ বেড়ানো, সঙ্গে পরতে পরতে রহস্যের জমাটি কড়াপাক মিশেল। জমাটি এই ‘কম্বো’তে আমরা গত ৫০ বছর ধরে কুপোকাত। আমার পুত্রের ‘বাদশাহী আংটি’র ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখার পর তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া –‘এই ফেলুদা ফাটাফাটি! আরো দুবার দেখাতে হবে’। অ্যানালগ থেকে ডিজিট্যাল যুগে পা দিয়েও ফেলুদা বয়সহীন। সত্যজিত রায় বয়সহীন।

আউটডোর ঠিক হওয়ায় আমার টিমের সবথেকে উৎসাহী এবং আনন্দে থাকা মানুষটির নাম বুনিদি (শ্রীমতি ললিতা রায়)। ট্রেনে যাওয়া হবে আর কি কি খাওয়া হবে, তার লিস্টি বানাতে এনার থেকে ব্যস্ত মানুষ আর মেলেনা। আবার ইনি তথ্যচিত্রের সাজ-সজ্জার দায়িত্বেও আছেন। উপরি, এনার পুত্র শ্রীমান সৌরদীপ এই ছবিতে স্টিল তুলেছেন এবং দ্বিতীয় ইউনিটের ক্যামেরার দায়িত্বে আছেন। মূল ক্যামেরাম্যানেরা মুম্বই নিবাসী, বহুদিনের বন্ধু এবং পোক্ত টেকনিশিয়ান পিনাকী সরকার এবং সুবোধ কার্ভে।

বেনুদার (সব্যসাচী চক্রবর্তী) ‘ফেলুদা’র জন্য দুটো আউটডোরের কিছু কাজ চলছে, তাই প্রথম সিনেমা ফেলুদা-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অংশের যোধপুর-জয়সলমীর অর্থাৎ রাজস্থান আউটডোরের কথাই বলি এখন। ‘বেনারস’ও আছে, তবে তার কথা অন্য সময় হবে।

সত্যজিত রায় ‘সোনার কেল্লা’ ছবির কোন একটি পোস্টার তৈরী করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘সোনার ছবি- সোনার কেল্লা’। ছবি তৈরীর ৪১ বছর (আমার থেকে ছবির বয়স বেশি, তাই একে ‘ছবি’দা বললেও দোষ নেই) পরে আমি মনে করি, এত সার্থকনামা ছবি আর তৈরী হয়নি। ‘সোনার কেল্লা’ ছবির ক্লাইম্যাক্স অংশে থাকবে বলে, শুধুমাত্র রাজস্থানে রেকি এবং মূল শুটিঙের জন্য দুবার গিয়েছিলাম। অন্যান্য ছয়-সাতটি জায়গায়-সোজাসুজি যাওয়া এমনকি ‘লন্ডন’ অবধি।

ফেব্রুয়ারী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের গোড়ায় যোধপুর পৌঁছলাম। স্টেশনে নেমে অটোরিক্সাকে ঠিক ছবির সংলাপের মত, ‘চলিয়ে সার্কিট হাউজ’ বলামাত্র কানের গোড়ায় ফেলুদা থিম সং বাজতে শুরু করল, শেষ হল সার্কিট হাউজে পৌঁছে ‘রেজিস্টার বুক’এ নাম লেখার শেষে। বাইরে থেকে ছবির সার্কিট হাউসের সঙ্গে ৪১ বছর পরের সার্কিট হাউসের মোটামুটি মিল আছে। বেমিল শুরু এখানকার দোতলা অংশ, অন্যপাশে পুলিশ ফাঁড়ি এবং ছবিতে ভবানন্দের ঘরের সামনে, যেখানে কাঁকড়া বিছে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে তৈরী হচ্ছে আরো একটা “ল্যান্ডিং পোর্চ”, মূলতঃ মন্ত্রী এবং পদস্থ আমলাদের “খুশি” রাখার জন্য | মন্ত্রী বা পদস্থ আমলারা কেউই ছবির “দর্শক” নন| ছবির “দর্শক” হওয়ার ইচ্ছেও তাদের নেই| এরা নতুন “পোর্চেই” নেশাগ্রস্ত |

কোনোমতে এক রাত কাটিয়ে, কাজ উশুল করে, পরদিন সক্কাল সক্কাল জয়সলমির যাওয়ার পথে “পোখরান”, “রামদেওরা” এবং “লাঠি”-স্টেশন “দর্শন” করে, জমাটি এক ধাবায় “নিরামিষ” খেয়ে বিকেলে পৌঁছলাম “সোনার কেল্লা”-র শহর জয়সলমির |

জয়সলমীরে “রেকি” টিম এর সদস্য চারজন| আমি, পিনাকী, সৌরদীপ এবং প্রোডাকশন হেড স্বপন সেনগুপ্ত ওরফে “কালীদা”| যোধপুর থেকে জয়সলমির আসার পথে “সোনার কেল্লা” নিয়ে রোমান্সে যে কোনো উৎসাহী মজতে বাধ্য |

দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমির বুক চিরে চলে গিয়েছে পিচের রাস্তা | ‘এখানেই তো কাচ দিয়ে মোটর এক্সিডেন্ট হয়েছিল’ কিংবা ‘বোর্ড পিন এর অংশটা নিশ্চই সামনের বাঁকটায়’ অথবা জটায়ু নিশ্চই এই কাঁটাগাছের সামনেই বলেছিলেন “ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব…বেদুইন!”-এই অবস্থা হতে বাধ্য | পাশ থেকে রেললাইন গেলে তো আর কথাই নেই…জাস্ট জমে কুলপি | চারজনের দলের দুজনের (সৌরদীপ, কালীদা) জয়সলমির এই প্রথমবার | তাই দুজনের কাছে জয়সলমির ‘পদে পদে বিস্ময়’ |

‘বিস্ময়’ আরো চাঙ্গা হয় বালিয়াড়িতে উটের পিঠে উঠে | ফেলুদার নির্দেশে উটের পিঠে ওঠার সময় ‘শরীরটাকে আগুপিছু’ করে নিলেও সৌরদীপের মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে: “উরিব্বাবা খুব চাপের জন্তু!” | দুপাশের রাশি রাশি বিয়ারের বোতল পাশ কাটিয়ে চলা শুরু| আবার কানের পাশে ‘ফেলুদা থিম মিউজিক’ বাজলেও কিছুক্ষন পর আমার অবস্থা হলো সঙ্গিন |

খানিক্ষণের জন্য উটচালক আমার হাতে উটের মুখে বাঁধা দড়ি দুটো দিয়ে সোজা পিঠটান | সেই দেখে উটের মহা আনন্দে দুলকি চালে ছোটার ইচ্ছে হল | আমাদের চারজনেরই তখন ‘জটায়ু’-র মতো অবস্থা | উট মানেই তখন ‘ভয়ঙ্কর জানোয়ার মশাই’! তবে ৩৬ ঘন্টা ট্রেনের ধাক্কা সহ্য করে উটের এই অভিজ্ঞতা না হলে জয়সলমির আসার পুরো মজাটাই পানসে হয়ে যেত |

কাটা ঘুড়ি যেমন দুলকি চালে লাট খেতে-খেতে কোনো বাড়ির ছাদ, কার্নিশ বা ল্যাম্পপোস্টে ঠাঁই পায়; আমরাও একইভাবে পৌঁছলাম কেল্লার ভেতর | যাওয়ার সময় শহরে কোনো উটের গাড়ি, উট, ময়ূরের টিকিমাত্র দেখতে পেলাম না | ৪১ বছরে জয়সলমির অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী | কেল্লায় ঢুকে সকলে বাকরহিত ও ছবি তোলার বিরাম নেই | ‘গিরিধারীর বাড়ি’, ‘মন্দির’, ‘হোলি খেলার জায়গা’, ‘রতনের বাড়ি’ এবং শেষে ‘মুকুলের বাড়ি’ | ‘সোনার কেল্লা’-র গন্ধ মেখে আছে পুরো ‘ত্রিকূট ফোর্ট’ | কিন্তু সকলেই কেল্লা কে বলে ‘সোনে কি কিল্লা’ বা ‘সোনার কেল্লা’ | ট্যুরিস্টদের কাছে কেল্লার এটাই পরিচয় এখন |

কেল্লার মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার লোকের বাস | ‘wifi connection ‘ থেকে শুরু করে মোজারেল্লা চীজের পিৎজা-সব কিছুই হাতের সামনে | হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম কিশোর পারেখের দোকানে | মূর্তি, হলুদ পাথরবাটি, দামি পাথর, পাথরের ফসিলস, পুরোনো ক্যামেরা-সব মিলিয়ে জমজমাট কিউরিও শপ | আর একপাশে টাঙানো বিশাল বড় সত্যজিৎ রায়ের ছবি | কিশোর পারেখ ১৩ বছর বয়সে ‘সোনার কেল্লা’ দেখে মুকুলের মতোই ঠিক করেন যে তাঁকেও ‘সোনার কেল্লা’-য় যেতে হবে | ‘৮০ সালের শেষে চলেও এলেন | আর ছোটবেলার শহরে ফিরে যাননি | মুখে শুধু ‘মানিকদা’ আর ‘সোনার কেল্লা’-র কথা | দেখে শুনে আমরা বাক্যহারা! বিশেষ করে সৌরদীপ | সে কল্পনাও করেনি যে তার ঠাকুর্দার বানানো ছবি কোনো মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, কিংবা আমিও ভাবতে পারিনি যে দোকানের নাম দেখব ‘মুকুল স্টোন শপ’ | সামনে দাঁড় করানো অটোর সামনে লেখা ‘মুকুল ট্যাক্সি’ | প্রিন্স হোটেলের মালিক অনিল ভাটিয়া হোটেলের বিভিন্ন অংশে সত্যজিৎ রায়ের ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন-এমনকি পুজোর জায়গায় অবধি | সত্যজিৎ রায় এঁর কাছে জয়সলমিরের ‘ভাস্কো দা গামা’ | যিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বালি-হলুদ সোনার রঙে রাঙানো কেল্লার উজ্জ্বলতা | ‘সোনার কেল্লা’ ছবির আগেও জয়সলমিরে সূর্য উঠেছিল, কেল্লায় সেই সূর্যের সোনালী ছটা লেগেওছিলো, কিন্তু ভাটিয়ার কথায়-‘মানিকদার মতো কেউ ভাবতে পারেনি | কেউ গল্পও লেখেনি আর |’ মানিকদার তৈরী ‘গুডউইল’-এর ওপর ভর করে ‘আজও জয়সলমিরের মানুষজনের পেটের ভাত জোগাড় হচ্ছে |’ পুরো ম্যাজিক ছাড়া আর কি ! জয়সলমিরে সত্যজিৎ রায় একজন ‘সুপারস্টার’ ও কুশল চক্রবর্তী ওরফে ‘মুকুল’ ‘মেগাস্টার’ | এই দুজন ব্যক্তিকে আর ‘সোনার কেল্লা’ ছবিটিকে যেভাবে শহরবাসী সযত্নে বুকে আগলে রেখেছে-তা যে কোনো বঙ্গসন্তানকে লজ্জায় ফেলে দিতে পারে |

অথচ একই কেল্লা, বালি, মরুভূমি তো ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতেও ছিল ! শুধু একটা ‘রঙিন ছবি’-র মূর্চ্ছনা কি ‘ম্যাজিক’-ই না ঘটাতে পারে ! ‘মুকুল’ এঁদের নিজের লোক কারণ তার নিজের বাড়ি তো কেল্লাতে-এই অকাট্য যুক্তির সামনে কি কিছু ধোপে টেকে?

মূল শুটিং শুরু হলো একমাস পরে, দুজন মুখ্য চরিত্রকে নিয়ে-কুশল চক্রবর্তী ও সন্দীপ রায় | বাবুদা-র (সন্দীপ রায়, যিনি ছবিতে স্টিল ছবি তুলেছেন) জয়সলমির আসা ‘জাস্ট মিরাকল’ আর ম্যাজিশিয়ান-এর নাম বুনিদি (ললিতা রায়) ও গ্রেট পুনু সেন (রমেশ সেন, যিনি সত্যজিৎ রায়ের সহকারী পরিচালক ছিলেন) | সত্যি কথা বলতে বাবুদা-র ভরসা আর উৎসাহ না থাকলে ‘ফেলুদা-৫০’ তথ্যচিত্র হতই না | দীর্ঘ ছবছর ধরে অপেক্ষা করার সময়, উনিও নিশ্চুপে আমার মতো অপেক্ষা করেছেন | অথচ ছবির পরিকল্পনা ওঁর সব জানা এবং প্রয়োজনীয় সব মশলা ওঁর নিজের কাছেই রয়েছে | আমাকে বাদ দিয়ে উনি নিজেই কাজটা করতে পারতেন | কিন্তু সেটা করেননি |

জয়সলমির শহরের মাপ ৫-৭ কিলোমিটার ছাড়ায় না | মূল শুটিংয়ে এঁরা দুজন শহরে পা রাখতেই লোকজনের জানতে দেরি হলো না-‘মুকুল দেশের বাড়ি এসেছে’ | ফলে বেপরোয়া হানাদারি শুরু হলো | সব দেখে ঠিক করলাম সকাল-সকাল কেল্লার ভিতরের কাজ সারতে হবে | নইলে একটু বেলা হলেই হাজার কয়েক লোক জড়ো হতে শুধু সময়ের অপেক্ষা…

সম্পাদকের নির্দেশে শব্দসংখ্যা মেনে এখানেই থামতে হচ্ছে | আর লেখা সম্ভব নয় | যাকগে, ডিসেম্বরে সিনেমা হলেই না-হয় ‘মূল শুটিং’-টা দেখে নেবেন !

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: রোববার ম্যাগাজিন|
অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় (সম্পাদক, রোববার ম্যাগাজিন)

ছবি সৌজন্যে: সৌরদীপ রায়|