‘বাতিল’ ঘরেরা

— শৌনক গুপ্ত

সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা চার বন্ধু। ইউনিফর্ম পরা, তবে কারোর শার্টের গোঁজাটা খোলা, কারোর কলারটা তোলা, কারোর আবার পকেটের রুমালটা গলায় জড়ানো। ছোট হয়ে আসা সস্তা সিগারেটটা তখনও হাতে হাতে ঘুরছে। স্কুল বাঙ্ক করে ওরা ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে দমকলের অফিসটার সামনে চলে এল। যেটা খুঁজছে সেটা এখন কাছেপিঠেই, কিন্তু ঠিক কোন জায়গাটায়, ঠাহর করতে পারছে না। একটু এলোমেলো ঘোরা, কাউকে জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা লাগছে। বুকের ভিতরে টানটান উত্তেজনা, সেটা চোখেমুখেও ধরা পড়ছে। ফুটপাথের টি-স্টল থেকে দোকানদার হঠাৎ বলে ওঠে, “ও ভাই, সামনে গিয়ে ডানদিকের গলি”। তার চোখ নাচানো হাসির উত্তরে বোকার মতো একগাল হেসে ওরা এগিয়ে যায়। বলে দেওয়া জায়গাটাতেই সাদা সিনেমা হলটা দাঁড়িয়ে। হাতে আঁকা বিশাল পোস্টার। হলিউডের বিখ্যাত নায়িকা বসে আছেন ‘ক্রসড-লেগ’ ভঙ্গিতে। সেই নিটোল অনাবৃত পা ছুঁয়ে বড় ইংরেজি হরফে লেখা ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’।

দুরন্ত সেই বয়সে স্কুল পালানো মানেই জীবনভর ‘বখাটে’ বনে যাওয়া নয়। হরমোনের উচ্ছ্বল তরঙ্গ ব্যালেন্স করতে করতে অনেকেই উত্তাল সময়টা সুতোর ওপর হেঁটে পার হয়ে যায়। গড়ে নেয় নিজের ভবিষ্যৎ। ওই চারজনের মধ্যে এমনই একজন ছিল – বিশ্বরূপ। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ তাক লাগানো রেজাল্ট করে বিদেশ চলে যায়। তারপর চাকরি আর সংসার নিয়ে সেখানেই সেটলড। বিশ বছর পর কলকাতায় ফিরে সে তো তাজ্জব। কী শহর কী হয়ে গেছে! একদিন কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে ‘কস্তুরী’-তে খেয়ে বেরোতেই উল্টোদিকের গলিটায় চোখ পড়ল। গলিটা যেন চেনা চেনা। একটু ভাবতেই মনে পড়ল। সেই প্রথম কৈশোরের উত্তেজনার স্মৃতি আবার দোলা দিয়ে গেল বিশ্বরূপকে। সে পায়ে পায়ে রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে এল। নাহ, যমুনা সিনেমা আর নেই। কৈশোরের সেই ‘নিষিদ্ধ’ জায়গায় সগর্বে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ‘লাইসেন্সড’ বার।

 

সঞ্চিতা শহরের নামী স্কুলের শিক্ষিকা। ডাক্তার স্বামী অরুণাংশু আর ষোড়শী আধুনিকা কন্যা টিনাকে নিয়ে সুখের সংসার। সেদিন নিউ মার্কেটে কেনাকাটা সেরে সঞ্চিতা আর টিনা অরুণাংশুর জন্য অপেক্ষা করছিল। ও এলে নিজামে লাঞ্চ করতে ঢুকবে। ওরা দাঁড়িয়ে ছিল কর্পোরেশনের পার্কটার কাছে। বিয়ের পর এখানেই সঞ্চিতা অরুণাংশুর সঙ্গে প্রথম সিনেমা দেখতে এসেছিল। সেই গল্প শুনে টিনা অবাক হয়ে বলল, “হাউ ফানি, তোমরা এই পার্কে সিনেমা দেখতে? অ্যাট দিস চ্যাপলিন স্কোয়্যার!” হো হো করে হেসে উঠেছিল সঞ্চিতা। তখনকার সেই হলটার গায়ে যে কিংবদন্তীর প্রতিকৃতি ছিল, তিনিও হয়ত এমন স্যাটায়ারে না হেসে পারতেন না। কিন্তু সে সুযোগ হল কই? চ্যাপলিন সিনেমার আর একটা ইঁটও যে অবশিষ্ট নেই। বহুদিন আগেই সে ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

 

গাড়িটা পার্ক করে অরুণাংশু যে পথে নিজামে সবচেয়ে সহজে আসতে পারত, সেটা ছেড়ে জানবাজার হয়ে এল। মেডিকেল কলেজে ঢোকার পরপর এই ঘুরপথেই আসতো বন্ধুদের সঙ্গেও। পথে পড়ত সোসাইটি সিনেমা। ঠিক সেখানেই গতি মন্থর হত। আড়চোখে বি-গ্রেড সিনেমার পোস্টার আর সিনেমা-দৃশ্যের কোলাজ অত কম সময়ে খুঁটিয়ে দেখে নেওয়ার স্কিল ওই বয়সই আয়ত্ব করতে পারে। এমনই ‘স্লো মোশন’ হত রিগ্যাল সিনেমার সামনেও। এখানে একবার ওরা দল বেঁধে একটা ‘এ’ মার্কা ছবিও দেখেছিল। ছবি শেষে বাইরে এসে মনে হচ্ছিল, রাস্তায় সবাই যেন ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। সে না হয় ছিল বয়সের দোষ। কিন্তু সেদিনও সেই দোষেই কিনা কে জানে, অরুণাংশু সোসাইটির কাছে একটু গতি কমালো। একটা সাধারণ ভোজপুরি ছবির পোস্টার। সত্যি, ‘ইন্টারনেট’ –এর দাপটে আজ ‘সোসাইটি’র ‘কাজ’ ফুরিয়েছে।

 

‘এসপ্ল্যানেডিয় সিনেমা’ নস্টালজিয়ার ভাঙা একটা টুকরো বুকে নিয়ে বিদেশে ফিরে গিয়েছিল বিশ্বরূপ। এইরকম অনেক রঙিন কাচের টুকরো ধর্মতলার অলিতে গলিতে পড়ে রয়েছে। বিশ্বরূপ, অরুণাংশু বা সঞ্চিতার মতো মানুষেরা এখনও পথ চলতে কখনও সখনও সেগুলো খুঁজে পায়। কুড়িয়ে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে সুখস্মৃতি রোমন্থন করে। হাতে তখন কটাই বা পয়সা? লাইট হাউসে তিনরকমের টিকিট – ফ্রন্ট-স্টল ১০ টাকা, রিয়ার-স্টল ১৫ টাকা আর দোতলায় ড্রেস-সার্কেল ২৫ টাকা। কলকাতায় একটা শ্রেণির ছেলেমেয়েরা সেদিনও ঢালাও পয়সা ওড়াতে পারতো। কিন্তু সিংহভাগের কাছেই ১০ টাকার দাম ছিল। তবু রিয়ার-স্টলে অভ্যস্তরা কখনও ড্রেস সার্কেলের ‘ফুটানি’ করেনি বললে সত্যের অপলাপ হবে। কাঠফাটা রোদ, লাইট হাউসের দরজা খোলেনি। এই সুযোগে উল্টোদিকে সেই আমলের বাবল-লিফটওয়ালা এসি মল শ্রীরাম আর্কেডে সেঁধিয়ে যাওয়ার মজা কেউ ভুলতে পারে? ঐতিহ্যবাহী লাইট হাউসের জায়গায় এখনকার ঝকঝকে শপিং মলটা যেন সেইসব ছেলেমানুষিকেও পরিহাস করে। তবু অনীক দত্তের ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিতে বন্ধ সিনেমা হলের নাম ‘বাতিলঘর’ শুনে সেই ‘বাতিঘর’ সিনেমার স্মৃতি উস্কে ওঠে।

 

পাশেই নিউ এম্পায়ার। ধারে ভারে সেদিনের লাইট হাউসের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তবু টিকে থাকার দৌড়ে নিউ এম্পায়ারই শেষ হাসি হাসল। অবশ্য ধার আর ভার দুইই বিকিয়ে দিয়েই। পকেট-ঠনঠন বাঙালি তরুণ সস্তায় নিউ এম্পায়ারে ঢোকার একটা চোরাপথ জানতো। সেটার কোড নাম ছিল ‘খাঁচা’। মাত্র ১০ টাকায় লোহার ব্যারিকেডের সেই খাঁচা এঁকেবেঁকে পার হয়ে সিঁড়ি ধরে দৌড়। হলের একদম ওপরের দিকে অল্প কিছু সিট। ছবি দেখতে নিচের দিকে ঝুঁকতে হয়; ডায়ালগ ভাল শোনা যায়না। তবু দিনের শেষে বন্ধুদের গোলগোল চোখের সামনে কলার উঁচিয়ে ‘সিনেমাটা নিউ এম্পায়ারে দেখে এলাম’ বলার মধ্যে অদ্ভুত এক আত্মপ্রসাদ ছিল। এখন সেই ‘খাঁচা’ বড় লোহার গেটের ওপারে বন্দী, গেটের সামনে জমজমাট রোল-চাউমিনের দোকান।

 

এই দুই তাবড় যুগলের খুব কাছাকাছি আরেক বড় খেলোয়াড়ের কথা ভুললে চলে না। সেই গ্লোব সিনেমায় ‘টাইটানিক’ দেখার স্মৃতি যাদের আজও টাটকা, তারাই জানেন ব্ল্যাকাররা সেদিন যে দামে টিকিট বেচেছিল তাতে মাল্টিপ্লেক্সও লজ্জা পাবে। আজ গ্লোব শুধু বন্ধই নয়, তার এন্ট্রি বা এক্সিট গেটটাও ঢাকা পড়ে গেছে। মাল্টিস্ক্রিনে অভ্যস্ত জেনেরেশন কি আর কখনও সেটা খুঁজে পাবে? খোদ সিনেমা হল নিয়ন্ত্রিত ‘ফ্লেক্সি ফেয়ার’ –এর জমানায় আদৌ জানতে পারবে, ‘ব্ল্যাকার’ কাকে বলে?

 

এই তিন মহারথীর গ্ল্যামারে যে অভিজাত সিনেমা হলটা তখনই ক্রমশ কৌলিন্য হারাচ্ছিল, এদের সবার মধ্যে সেই মেট্রো সিনেমার লোকেশন কিন্তু সবচেয়ে ঈর্ষণীয় ছিল। শুধু সিনেমা দেখা নয়, সেই নেই-মোবাইলের যুগে নিজেদের মধ্যে দেখা করার মোক্ষম জায়গাটাও ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্রের মেট্রো সিনেমা। ইংরেজি সিনেমার বদলে চলতি হিন্দি সিনেমাকে বেশি আঁকড়ে ধরে মেট্রো যেন গ্ল্যামারের দৌড়ে একটু একটু করে পিছিয়ে পড়লো। তারপর একসময় বাতিলই হয়ে গেল। তবে হেরিটেজ বিল্ডিং মেট্রো আবার সেজে উঠছে। শপিং মল আর মাল্টিপ্লেক্স যদিও নিশ্চিতভাবেই তার পুরনো গন্ধের নস্টালজিয়ায় উগ্র আতর মাখিয়ে দেবে। সেটাই তবু ভাল। না হলে হয়ত তার প্রতিবেশী সিনেমা হলটার মতো দশা হত। রাস্তার ধারে ভূতের বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে, গায়ের ওপর ঝুল ধরা বড় নামটা যেন তাকেই ব্যঙ্গ করছে – ‘এলিট’।

 

গল্পটা চলতেই পারতো, কিন্তু এই একঘেয়েমির আর প্রয়োজন নেই। লোটাস, জ্যোতি, নিউ সিনেমা – রাস্তার ধারে সার ধরে দাঁড়ানো ‘মৃতদেহ’গুলো একই গল্প শোনাবে। তারপর একদিন নতুন বাবু টাকা ঢালবে। ওরা আবার রঙ মেখে সেজেগুজে দাঁড়াবে। জৌলুস বাড়বে, টাকা বাড়বে, কিন্তু বড্ড অচেনা লাগবে ওদের। বিশ্বরূপ, অরুণাংশু আর সঞ্চিতার বয়স আরও বেড়ে যাবে। অশক্ত পায়ে নাতি-নাতনীর হাত ধরে কোন উত্তরাধুনিক সিনেমাপ্লেক্সে গিয়ে বসবে। কমে আসা চোখের জ্যোতি তবু হয়ত দেখবে হলের ভিতর গদি-ছেঁড়া সিট থেকে সিটে ঘুরছে কয়েকটা সস্তা টর্চের হলুদ আলো আর সার দিয়ে রাখা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতলে ওপেনার বুলিয়ে দেওয়ার শব্দ ঘোষণা করছে ইন্টারমিশন।

 

ঠিকানাঃ

ডি-৬৭, পূর্ব রাজাপুর

পো – সন্তোষপুর, থানা – সার্ভে পার্ক

কলকাতা – ৭০০০৭৫

 

ফোনঃ

(+৯১) ৯৮৩৬৪১৮১২৩/ ৯৪৩৩৪৬৮১৯৬

 

ই-মেলঃ

shounakgupta007@gmail.com