বায়স্কোপের গয়না

—  পিয়ালী চক্রবর্ত্তী

   নারকোলের বালা একজোড়া, চুনি বসানো চুড়ি, বালা সবসমেত আঠাশ জোড়া। কানের দুল উনিশ জোড়া। না, না এসব কোন দোকানের স্টক নয়, এ হল রাসমণি অরফে রাসু পিসীমার গয়নার বাক্সের হাল হকিকত। মনে পড়ে পিসীমাকে? এগারো বছর বয়সে বিধবা, লাল পেড়ে শাড়ি খুলিয়ে পরিয়ে দিয়েছে সাদা থান, হাঁটু ছাড়ানো এক গোছা চুল কেটে, ছোট করে ছেঁটে পাঠিয়ে দিয়েছে বাপের বাড়ি। সেখানে ফ্যানা ভাত আর দুটো কাঁচকলা সেদ্ধ খেয়ে দিন গুজরান। কিন্তু তাতে পিসীমার দাপট কমেনি একবিন্দু। তাকে সমীহ করে চলে গোটা বাড়ি। কারণ, তার কাছে অগাধ ঐশ্বর্য, বিয়েতে পাওয়া একখানা গয়নার বাক্স। চুড়ি বালার সাথে সাথে আবার দশভরির বিছে হার, টায়রা, টিকলি, নথ, নুপুর কি নেই। বাড়ির নব-বিবাহিত বৌদের একটু আধটু দিয়ে থুয়ে, বাকি যা পড়ে থাকে, তা গুনে সাদা কাগজে হিসেব লিখে রাখে পিসীমা। যক্ষের ধণের মত আগলে রাখে বাক্সটা। কারণ, সে জানে বাল্যবিধবা বোনের ওপর দাদাদের ভালবাসা শুধু তার ওই গয়নার জন্যই। কিন্তু গয়নার মায়া ছাড়া কি এতই সহজ? তাই মরে গিয়ে ভূত হয়েও, দিব্যি পিসীমা লুকিয়ে ফেলেন তার গয়নার বাক্স, বাড়ির ছোটবউয়ের সাহায্যে, আর কড়া নজরদারিতে রাখেন ছোটবউ আর তার সাধের বাক্সখানাকে। হালফিলের সিনেমা ‘গয়নার বাক্স’, কাহিনীর সব উত্থান পতন এই গয়নাকে কেন্দ্র করে। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি গয়না পাগল পিসীমা অব্দি শেষ পর্যন্ত তার সব গয়না দান করে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।

গয়না নারীর ভূষণ ঠিকই, কিন্তু সিনেমায় কি পুরুষ কি নারী, সবার অঙ্গেই গয়না একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে। রূপোলী পর্দায় প্রসাধনের সাথে গয়না এক আলাদা ঔজ্জ্বল্য আনে। কিন্তু গয়না কি শুধুই অঙ্গের ভূষণ হয়েই থেকে গেছে? একেবারেই নয়, কাহিনীর ওঠাপড়া, সম্পর্কের নানান দিক, চরিত্রের অনেক অলিগলি দর্শক ঘুরে বেড়িয়েছে গয়নার হাত ধরে। ধরা যাক ‘সাহেব-বিবি-গোলাম’এর প্রথম দৃশ্য। যখন ইংরেজ রাজত্বে কলকাতার বনমালী সরকার লেন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের মধ্যে। আর বিখ্যাত চৌধুরীদের জমিদারবাড়ি ভাঙ্গার কাজের দায়িত্ব পড়ল তার হাতে, যে একদিন এ বাড়ির ছোটবৌঠানের স্নেহধন্য ছিল। ভূতনাথ। প্রথম যেদিন এ বাড়ির ছোট গিন্নীর সাথে পরিচয় হয়, গলায় সোনার হার, নেকলেস, কানে ঝুমকো, খোঁপায় সোনার কাঁটা, একেবারে ঝলমল করছিলেন জমিদার গিন্নী। জমিদার বাড়ির শিকল, মদ্যপ স্বামী, সুখের নামে এক ভয়াবহ অসুখের মধ্যে বাস করতে করতে, সেই ছোটবৌঠানই একদিন একটার পর একটা সোনার গয়না খুলে দিতেন ভূতনাথকে মদ এনে দেবার জন্য। একাকীত্ব থেকে নেশা, আর সম্বল সেই গয়না। বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া যায় একটা কঙ্কাল, তার হাতে কয়েকগাছা চুড়ি। ভূতনাথ চিনতে পারে তার বৌঠানকে। রাসমণি গয়না পেয়েও পরতে পারলেন না, গয়না পেয়েও নেশার ঘোরে সব হারিয়েছিলেন জমিদার গিন্নী, কিন্তু কিছু না পেয়ে বড় হওয়া, এমনকি বড়লোক শ্বশুরবাড়িতে কুলবধূর মর্যাদা না পাওয়া প্রফুল্ল, যেদিন হয়ে উঠলেন ‘দেবী চৌধুরানী’, সেদিন দস্যুরানীর গায়ে ঝলমল করছিল সীতাহার, নেকলেস, কানে ঝুমকো, কোমরবন্ধ, নথ, টায়রা-টিকলি। সে অলঙ্কার তার শৌর্যের অলঙ্কার, নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাবার গরিমা। মনে পড়ে ‘অপুর সংসার’ এর অপর্ণাকে? গ্রামের সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়ে অপর্ণা, বিয়ের দিন মা-বাবা মাথা থেকে পা সোনায় মুড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু পাত্র বদল হয়ে, অপুর সাথে বিয়ে করে কলকাতায় এল অপর্ণা। ঘিঞ্জি পাড়ার এক বাড়িতে, এক চিলতে ছাদের ঘরে অপুর বাস। ঘরে চারিদিকে দারিদ্রের ছাপ, অনাড়ম্বর, অগোছালো আর তার মধ্যে এক অপরূপা মেয়ে, সর্বাঙ্গে সোনার গয়না, কনের সাজ। কি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাই অপর্ণার সেই মূহুর্তের আকুল করা কান্নায় বুঝতে অসুবিধা হয়না তার অসহায়তা।

বাংলা সিনেমার গয়না মানেই বারোমেসে সোনার হার, বালা, চুড়ি, বাউটি, নুপুর, কানের দুল, যেসব গয়না আমরা মা-মাসিদের পরতে দেখেছি। এসবের প্রতি মোহ, আকর্ষণ তো থাকেই, কিন্তু বড়লোক স্বামী, না চাইতেই সব পেয়ে যাওয়া, নিঃসন্তান একা জীবন, তাই ‘মণিহারা’র নায়িকা মণি শুধু গয়নাকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চায়। গয়নার সাথই তার ওঠাবসা। প্রেম, ভালবাসা, আত্মত্যাগ এসব কিছু ক্রমশ তুচ্ছ হয়ে যায় তার কাছে। স্বামীর চরম বিপদের দিনে, পাছে তার গয়নায় হাত পড়ে, তাই রাতারাতি সমস্ত গয়না পরে ঘর ছাড়ে সে। আর ফেরে না, শুধু ফেরে তার অতৃপ্ত আত্মা। স্বামীকে দেখতে নয়, তার পাওনা গয়না আদায় করতে। একটা কঙ্কালের হাত খামচে ধরে গয়নার বাক্সটা, দর্শক স্তম্ভিত হয়ে যায়।

আবার সেই সিনেমার চরিত্ররা যখন রোজের জীবন থেকে বেড়িয়ে পড়ে অরণ্যে, আদিবাসীদের ধামসা, মাদল, মহুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে খুঁজতে চায় পাওয়া, না-পাওয়ার হিসাব। তখন ছোট সাঁওতাল গ্রামের অতি ছোট মেলায় শিশুর মত মেতে ওঠে অসীম, সঞ্জয়, হরি, শেখর, অপর্ণা আর জয়া। সাঁওতালদের হালকা ব্রোঞ্জের তৈরী রূপোলী সব গয়না, তাবিজ, তাগা, হার, চুড়ির মধ্যে মিশে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। পালামৌয়ের জঙ্গলের মৌতাত, সেখানকার গহীন অরণ্যের মত বন্য হওয়ার হাতছানি। আর তাই বাঙালী ঘরের যুবতী বিধবা জয়া, সেইসব গয়না পরার পর স্বল্প পরিচিত যুবক সঞ্জয়ের সামনে নিজেকে মেলে ধরে। অল্পবয়সে স্বামীকে হারানো, সন্তানের দায়িত্ব, সবকিছু ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসে তার অবদমিত আকাঙ্ক্ষা। অনায়াসে সঞ্জয়ের হাতটাকে নিজের বুকে ছুঁয়ে জয়া বলে ওঠে ‘দেখুন আমার ভয় করছে’।

গয়না কখনও শৃঙ্খল, কখনও কামনা, কখনও ইর্ষা, কখনও শুধুই আভিজাত্য। গত দুদশকে এই অনুভূতিগুলোকে বারবার স্পর্শ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাই ওনার সিনেমায় গয়নার ব্যবহার খুব চোখে পড়ে। ‘উৎসব’ সিনেমায় বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে বাংলার ঐতিহ্য ফুটে ওঠে বাড়ির মেয়ে-বৌদের গয়নায়। ছোটবউ মণিকা বড়লোকের মেয়ে। তার গয়নার ঝলকানি বাকিদের থেকে একটু বেশি। একটু যেন হাল্কা প্রতিযোগীতা সবার সাথে। অথচ সেই অহংকারী বউটি স্বামীকে আশ্বস্ত করে ‘আমার সব গয়নাই ইমিটেশন নয়’। বাঙালী দর্শক বিভোর হয়ে যায় ‘চোখের বালি’তে বেনারসী, হার,দুল,বালা,বাউটি, রতনচূড়,টায়রা টিকলিতে মোড়া অপরূপা বিনোদিনীকে দেখে। সেই বিনোদিনীও বিধবা হয়। এরপরের ঘটনা সবার জানা। আশার সাথে এক অদ্ভুত প্রতিদ্বন্দিতা তার তলে তলে। তার রূপের জৌলুষে সে হারিয়ে দিতে চায় আশাকে। সাদা থানের ওপর সে পরে ফেলে গয়না। তার ভিতরের আগুনকে যথার্থ রূপ দিতে কি অপরিসীম চেষ্টা বিনোদিনীর। উনিশ শতকের বাংলার কারুকার্য করা গয়না কোথাও বা প্রতীক হয়ে ওঠে বিনোদিনীর গোপন প্রেমের। ঠিক তেমনই বেনারসী, চন্দন আর গা-ভর্তি গয়নায় সেজে রাধিকা প্রবেশ করে শ্বশুরবাড়িতে, স্বামী ইন্দ্রনীলের সাথে। ইন্দ্রনীল একজন কবি। তার জগত তার ফ্যান্টাসি। বাস্তবের সাথে তার যোগাযোগ নেই। বিবাহিত জীবনের সব দায়-দায়িত্বে আটকে গিয়ে ক্রমশ ক্লান্ত আর একা হতে থাকা রাধিকা যেন এক বিষাদ প্রতিমা। চওড়া পাড়ের সুতি, হাল্কা সিল্ক শাড়ির সাথে মানানসই গয়না, ঝোলা দুল আবার কখনও ক্রিস্টালের সাথে হাল্কা সোনার লকেট আর সোনার দুলে রাধিকার এই দোলাচলের মুডটা খুব সুন্দর ফুটিয়েছিলেন পরিচালক ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ ছবিতে।
তেমনই চড়া মেক-আপে, গলায় ঝলমলে হার, কানে দুল, নাকে নথ, হাতে কাচের চুড়ি, থিয়েটারের রানী নটী বিনোদিনীর রূপ যেন ঠিকরে বেরোয় মঞ্চে। আবার সেই মেয়েই সোনার হারে, হাতে ক’গাছা চুড়ি পরা এক নিতান্ত সাধারণ বিরহীর মত তার শোবার ঘরে, অনন্ত প্রতীক্ষা করে তার মনের মানুষটির। নটী বিনোদিনীকে বড় যত্ন করে ফুটিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ তার ‘আবহমান’ ছবিতে।

গয়না পেলেই প্রেমিকারা খুশ, এমনটা সবাই বলে। আর সিনেমার নায়ক যদি হয় বড়লোক বাপের একমাত্র সন্তান, টাকা ওড়ানো তার শখ, মদে তার শান্তি। ১৯৮৪-র সিনেমা ‘শরাবি’। নায়কের কাছে নায়িকার আব্দার ‘মুঝে নওলখা মাংগওয়া দেরে যো সঁইয়া দিওয়ানে, তুঝে গলে সে লাগা লুঙ্গি ও সঁইয়া দিওয়ানে’। গয়নার যা দাম, ভিড়ের মধ্যে একখানা কানের দুল হারিয়ে গেলে কি হবে ভাবতে পারছেন? তাই ১৯৬৬ তে এইরকমই হিট গানে সাধনা মোটামুটি নাচিয়ে দিয়ে গেলেন সমস্ত সিনেমাপ্রেমীকে। ‘ঝুমকা গিরা রে,বরেলীকে বাজার মে’। সিনেমার এরকম কালজয়ী হিট গানেও রমরমা রাজত্ব গয়নার। ‘গোরী হ্যায় কালাইয়া, পহেনাদে মুঝে হরি হরি চুড়িয়া’, ‘তেরি পায়েলিয়া নিন্দ চুরায়ে, সরগম গায়ে’।

আবার একটু ভিন্ন ধরণের গয়না, অন্তত ১৯৭৮ সালের প্রেক্ষিতে একটু মডার্ণ আবার কিছুটা গ্রাম্য গয়না পরে ‘রূপা’ চরিত্রে যে প্রাণ দিয়েছিলেন জিনাত আমন, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ছবির রূপোলী সেই হার,কানের দুল, পায়ের মল পরা মেয়েটা দর্শকের মনে একই আবেদন রেখে চলে আজও।

সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘দেবদাস’ বিরহের কাহিনী হয়েও গয়নার ব্যবহারে যথেষ্ট উজ্জ্বল। বিয়ের পরে প্রথাগত হার-চুড়িতে সেজে পার্বতী লুকিয়ে রাখে যন্ত্রণা আর বাঈজি বাড়ির ঘুঙুরের তালে, জড়োয়ার হারে চন্দ্রমুখীর মধ্যে একটুকরো শান্তি খুঁজতে চায় দেবদাস।

ভারতের ইতিহাস বলে, মুঘল বাদশাহ থেকে শুরু করে পরবর্তী সব সম্রাট বাদশাহের আমলে গয়নার রমরমা ছিল। গয়নাই তখন তাদের আভিজাত্য। পায়ের নাগরা থেকে মাথার মুকুট অব্দি হীরে, পান্না, জহরতে চকচক করত। মুঘলে আজমেও মণি-মুক্তো, হীরে-জহরতে সাজানো সিনেমায় সেলিম-আনাকলির ব্যর্থ প্রেমকাহিনী এক অনবদ্য যুগলবন্দী। আবার সম্রাটের আসল খ্যাতি তার বাঈজী বাড়ির রোশনাইয়ে। বাঈজীর গলার মুক্তোর মালা, জড়োয়ার হার, হাতে চুনী-পান্নার আংটি, রতনচূড়, হীরের দুল, টায়রা-টিকলি আর দুপায়ে ঘুঙুর পরা পাকিজার মীনা কুমারী, উমরাও জানে’র রেখা, গয়না ছাড়া এসব চরিত্রের আসল রংটাই খুঁজে পাওয়া যায়না।

গয়নার লোভ শুধু প্রেমিকার? মোটেই না, ‘হীরক রাজার দেশে’, হীরের হারের লোভে মন্ত্রীদের চোখ চকচক করে। অত্যাচারী রাজা হীরার খনির জোরে, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষকের ওপর চালায় অমানবিক অত্যাচার।

পৌরাণিক, ঐতিহাসিক সমস্ত সিনেমা, সেই ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ থেকে হালের ‘যোধা আকবর’ সবেতেই গয়নার ব্যবহার হয়েছে আর হয়েছে সিনেমার চাহিদা মেনেই।

অনেক জৌলুসের মাঝে তবু বারবার ভেসে ওঠে সেই অভিজাত অথচ করুণ চেহারাটা। গলায় মুক্তোর মালা, হাতে চুনী পান্নার আংটি, মাথার টুপিতে দামী পাথর আর পালক, কিন্তু লক্ষ্ণৌয়ের সম্রাট ওয়াজিদ শাহের দরবারে এসেছে ইংরেজের শমন। শীঘ্রই গদিচ্যুত হবেন সম্রাট। বাইরে যার বাহারী অলঙ্কার, ভিতরে তিনি বিভ্রান্ত। মনে করছেন সম্রাট হওয়ার যোগ্যতা তার ছিলনা কোনদিন। তার শরীরের সব অলঙ্কার যেন তাকে পরিহাস করে আর স্বভাবকবি সম্রাট অস্ফুটে বলে ওঠেন – ‘তড়প তড়প সগরি রৈন গুজরি, কৌন দেশ গ্যায়ে সাঁওরিয়া’। ছবির নাম শতরঞ্জ কে খিলাড়ি।
(প্রকাশিত – পত্রিকা- তত্ত্ব তালাশ, ২০১৫ সংখ্যা, সৌজন্যে – আনন্দবাজার পত্রিকা)