শতবর্ষের দোরগোড়ায় ভারতের বাংলা সিনেমা-কি কি পেতে পারি?

—  শুদ্ধ সত্ত্ব বসু

বাংলা সিনেমা একটা বিশাল ব্যাপার মনে হয়! এ নিয়ে লিখতে বসে নতুন কোনো কথা বলা সহজ নয় কেননা অনেক গুণী সমালোচক ও বোদ্ধা বেশির ভাগ কথা বলে দিয়েছেন তাই আমি এক সাধারণ দর্শক হয়ে চর্বিত চর্বন করতে চাই না.

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় কলকাতায় বাংলাভাষার সিনেমা জন্ম ১৯১৭ সালে হীরালাল সেন এর হাত ধরে সেই সময়ের ভারতের সিনেমার রাজধানী হয়ে ওঠার ভেতরে. মার্কিন সিনেমাটোগ্রাফের উইলফোর্ড ডেমিং অনেক আহ্লাদে ১৯৩০ এর টালিগঞ্জে পাড়ার সিনেমার ডাক নাম দিয়েছিলেন “Tollywood” হলিউড এর সাথে ছন্দ মিলিয়ে!
এমনকি ডেমিং সাহেব একবার এটাও ভেবেছিলেন টলিউড না না বলে “Hollygunje ডাকবেন. ভাগ্গিস সেটা হয়নি!

তাহলে কেমন যেন একটা howling holly ম্যাডাম এর গাঁ গঞ্জ হয়ে রয়ে যেত বলে মনে হয় মৃনাল মানিক উত্তম হৃত্তিকএর কর্মস্থান.

তবে হ্যাঁ ,শতবর্ষের কাছাকাছি এসে Deming সাহেবের আহ্লাদে হতাশার howling পুরিতে পরিণত হতে পারে যদিনা আমরা সবাই দর্শক ,নির্মাতা ,নির্দেশক এবং কলাকুশলীরা সবাই মাইল রুখে না দাড়াই আমাদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে.

আমার এই লেখাটা হয়তো কিছু পাঠকের একটা দিকভ্রান্ত জাহাজের মতো লাগতে পারে ,তবে সেটা খানিকটা ইচ্ছাকৃত
এটা যেন বাংলা সিনেমা নামক বিশাল জাহাজটার এক অদ্ভুত কঠিন সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ঝোড়ো সময়ের প্রতিচ্ছবি|

আমি এই লেখাটায় কলকাতায় তৈরী বাংলা সিনেমার আসন্ন বিপদের দিকটা তুলে ধারার চেষ্টা করছি প্রথমে এবং লেখাটার শেষের দিকে নতুন সম্ভাবনার কিছু কথা ও সামান্য উল্লেখ করবো. আমার পক্ষে এটা করা সুবিধের কারণ আমি সাধারণ দর্শক . আমি বিশ্বাস করি নতুন কিছু সৃষ্টি করার জন্য অতীত এবং বর্তমানকে একটু সন্দেহের চোখে খোঁচা মারাটা খুব দরকার নয়তো যেকোনো creative process “complacent ” হয়ে যায় |

কলকাতার বাংলা সিনেমার যাত্রাপথের অনেকটাই হলো হতাশার আর ক্রমাগত creative অবক্ষয়ের journey ,ঠিক যেমন শহর কলকাতার আর আপামর বাঙালিদের ক্রমাগত অর্থনৈতিক আর সামাজিক পিছিয়ে পড়া, হেরে যাওয়া আর হারিয়ে যাওয়ার গল্প ! অতীতের মৃনাল- সত্যজিৎ -ঋত্বিক দের সৃষ্টিশীলতায় বর্তমানের বেশিরভাগ নির্দেশকরা এখনো আচ্ছন্ন . সেটা আচ্ছন্নতা না কুপমন্ডুকতার প্রবল ইচ্ছে তা আমি বলতে পারবোনা ! তবে এখনো সত্যজিতের “নায়ক” এর ছায়া ভাঙিয়ে নতুন পরিচালককে debut করতে হয় ,ঋত্বিকের জীবনের গল্পের ওপর অপটু biopic বানাতে হয় আর মধ্যবিত্ত বাঙালিকে হলে ফেরানোর নাম করে মা মাসিদের সুড়সুড়ি দিয়ে box office হাতাতে হয় .অবশ্য এতো হতাশার মাঝেও আমরা ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর ” ফড়িং” ,কৌশিক গাঙ্গুলীর “বিসর্জন” ,আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তর “আশা যাওয়ার মাঝে”, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ” বাকিটা বেক্তিগত” এবং Q এর “গান্ডু/ LUDO ” র মতো অনন্য অসাধারণ নির্মাণ আমরা পেয়েছি . কিন্তু এইসব ছবিকেও হয়তো বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা বা সেন্সর বোর্ডের ঝুট ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় . এর পরেও যে আমরা এই ছবিগুলো দেখতে পাই তা অবশ্যই আমাদের ভাগ্যের কথা . এই দুরন্ত, দামাল ,অপ্রতিরোধ্য পরিচালকরা যেন আমাদের আরো ভালো কাজ উপহার দিতে পারেন ,কোনো অনিশ্চয়তা বা বিপত্তি ছাড়া এই আশাই করি .

অনেক পরিচালকরাই এখন গর্ব করে বলে থাকেন যে তারা বাংলা সিনেমার market টাকে বড় করছেন , বড় টাকার প্রোডাকশন করছেন এবং প্রোডিউসারকে টাকা ফেরত ও দিচ্ছেন ,নতুন filmy টেকনিক আমদানি করে ! কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন যে সেটা করতে গিয়ে তারা খুব সেফ খেলে ফেলছেন. সিনেমাশিল্পের মতো ব্যয়বহুল এবং এলিটিস্ট মাধ্যমকে আরো এলিটিস্ট করে ফেলছেন. আমরা সবাই জানি গ্রাম ,গঞ্জ,মফস্বলে বাংলা সিনেমা মুক্তি পায়না .বাণিজ্যিক বাংলা ছবির স্বপন সাহা, হরনাথ চক্রবর্তীদের সুসময়এর এই পাইরেসি র বাজারে সুদিন র নেই . আজ থেকে তিন চার দশক আগে যখন সত্যজিৎ , তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার দাপটের সাথে ছবি করছেন তখন গ্রাম বাংলার খেতে খাওয়া মানুষ এতো ব্যাপক হারে সিনেমা দেখতেন না . তাই এই মহান নির্দেশকদের এলিটিস্ট দুর্নাম জোটেনি .কিন্তু এখনকার পরিচালকদের এ বিষয়ে সচেতন হয় খুব জরুরি ! কলকাতা বা NRI ভিত্তিক ট্যাশমার্কা আর মেলোড্রামামাটিক সিনেমার চেনা ছক তারা ভাঙতে চাইছে কিনা, তা আমাদের দেখা এবং বোঝা দরকার.

ব্যবসায়িক সাফল্যের মাধ্যমে যথার্থ সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টা একসাথে করা নিশ্চই সম্ভব . যথার্থ গুণী পরিচালক বুদ্ধদেব দাসগুপ্তএর “মন্দ মেয়ের উপাখ্যান” প্রোডিউসারকে প্রোডাকশন ভ্যালুর বারো গুন্ টাকা ফেরত দিতে পেয়েছিলো .

ইদানিংকালের মার্কেট রিয়ালিটি র জন্য এখন যেকোনো রিজিওনাল বা কমার্সিয়াল সিনেমার দর্শক কে বাজে জিনিস পরিবেশন করে চ্ট জলদি মুনাফা করলে পুরো ইন্ডাস্ট্রি র লং টার্ম ক্ষতি হয়ে যায় .একদশক আগের বিগ ব্যানার ও মাল্টিস্টারার ফর্মুলা ভিত্তিক হিন্দি ছবিও এখন উধাও !এই অদৃশ্য মার্কেট রিয়ালিটি বাংলা ছবিকে পথ দেখাক নতুন ভাবনা ভাবতে নতুন রাস্তা খুঁজতে .

ইউটুবে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ,MMS ক্লিপ্স ,ফাউন্ড ফুটেজ সিনেমা আর হাতে হাতে স্মার্ট ফোনের দৌলতে আমরা সবাই এখন একাধারে ফিল্মমেকার ও অডিয়েন্স .

কিছুদিন আগেই শুনছিলাম “bahubaali 2 ” পশ্চিম বাংলার সব প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে ! এবং তাতে নাকি বাংলা সিনেমার ভাগ্যদেবীর কপালে গুরুতর চিন্তার ভাঁজ! এই চিন্তাটা কিন্তু খুব একটা অমূলক নয় .এতদিন বাংলা সিনেমার সংকটের কারণ ছিল পাইরেসি ,বাজেট, গা গাঞ্জা মফস্বলে ডিস্টিবিউটারে অভাব . তবে এই প্রথম ভারতের এক প্রাদেশিক সিনেমার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে আর এক প্রাদেশিক সিনেমা কে পড়তে হচ্ছে !

এটা নিশ্চয় নতুন একটা ট্রেন্ড! তাহলে কি তলায় পাড়া ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সিনেমা বানাতে হবে দর্শক টানতে গেলে ?? উত্তরটি নিশ্চয় না!! কাউকে টেক্কা দিতে গেলে অনুকরণ কোনো সময় ই বাঞ্চনীয় নয়. সিনেমাটিকে বা আর্টিস্টিক সৃষ্টিশীলতার বাঙালির কোনোদিন অভাব ছিল না. এখন শুধু এর মধ্যে একটু ব্যবসায়িক ক্রিয়েটিভিটি আনতে হবে. তাহলেই আমি নিশ্চিত যে কলকাতায় নির্মিত আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য সফল ছবির নতুন যুগের শুভারম্ভ হবে.

কি কি পেতে পারি:-

১. বাংলা সিনেমা মানে বাঙালির তৈরী, বাঙালির মতো সিনেমা! সেটার বড়ো মার্কেট ধরতে গেলে মূলত লিঙ্গুয়াল হতে পারে! এ যুগের হাওয়া অনুযায়ী আমরা যেমন কেউই আর সারাদিন এক ভাষায় কথা বলি না, তাই সেই নিয়ম অনুযায়ী সেই সাবলীলতা উঠে আসতেই পারে!

২. সিনেমা এখন স্মার্ট ফোন এ রিলিজ করে! অন্ধকার হল এর রূপলো পর্দা এখন কালের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে! মফস্বলের রুগ্ন হল গুলোর অবস্থ কান্না কাটি/সরকারি দক্ষিনের অপেক্ষা না করে, আমরা কি বাংলা মোবাইল এপ্লিকেশন বা ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন টেকনোলজি ভিত্তি করে নতুন ছবি মুক্তির কথা ভাতে পারি না ??

৩. ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট এখন মিক্সড বা অগমেন্টেড রিয়ালিটির দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে! আমরা এই নতুন প্রযুক্তি কে তাড়াতাড়ি গ্রহণ করে নতুন যুগের সূচনা করতে পারি না?? কলকাতা বা বর্ধমান বা মালদা তে প্রথম মিক্সড রিয়ালিটি নেটওয়ার্কের বাংলা এক্সপেরিয়েন্স থিয়েটার হতে পারে না ? এই disruption এর যুগে এর খরচ কিন্তু হলফ করে বলতে পারি ১০ কোটি টাকার ভেতর হবে!!

৪. নতুন ভালো গল্প বা স্ক্রিপ্ট এর খোঁজ এ নতুন চিত্রনাট্যকার দের জন্য ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা নিশ্চই যেতে পারে #HBFF এর মতো যথাযত মঞ্চ থেকে!!

আসুন নতুন বাংলা কনটেন্ট এবং রোমাঞ্চকর বাঙালির বিনোদন নতুন দিন এর এর স্বপ্ন দেখি.

কে বলতে পারে আপনাদের মধ্যেই হয়তো একালের হীরালাল সেন লুকিয়ে আছেন ?

জয় গুরু
জয় #HBFF !! 🙂